দর্শক সন্তুষ্টির লক্ষ্যে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর জোর প্রয়াস
২০১৭

দর্শক সন্তুষ্টির লক্ষ্যে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর জোর প্রয়াস

December 29, 2014     Published Time : 03:19:21

টেলিভিশন চ্যানেল

শেষ হতে চলেছে ২০১৪। আর তাই হিসাব-নিকাষের পাল্লায় তুলে এ পুরো বছরটার মূল্যায়ন এখন চলছে সব মাধ্যমকে ঘিরে। টেলিভিশন মাধ্যমটি নিয়েও চলছে তেমনটা। দেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর সারা বছরের কার্যক্রমের বিশ্লেষণে দেখা যায়, নতুন পুরনো সব ক’টি টিভি চ্যানেল দর্শক সন্তুষ্টির লক্ষ্যে ছিল জোর প্রয়াসী। সব চ্যানেলই অনুষ্ঠানের মান বাড়াতে নানা আয়োজনে রাঙিয়েছে নিজ নিজ চ্যানেলের পর্দা। নতুন নতুন নাটক, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান, সংগীতানুষ্ঠান, নৃত্যানুষ্ঠান, টকশো, সবকিছুতে ভিন্নতা আনতে সচেষ্ট ছিল সবাই। শুধু তাই নয়, দর্শক ধরে রাখায় সবাই মেতেছিল নতুন কিছু উপহার দেয়ার চেষ্টায়। তবে এ চেষ্টায় অংশ নিতে গিয়ে চ্যালেনগুলো অনুষ্ঠান প্রচারে সঠিক মান বজায় রাখতে পারেনি কোন কোন ক্ষেত্রে। ২০১৩ সাল পর্যন্ত দেশে টেলিভিশন চ্যানেল ছিল ২৭টি। এগুলো হলো বাংলাদেশ টেলিভিশন, এটিএন বাংলা, চ্যানেল আই, একুশে টেলিভিশন, এনটিভি, বাংলাভিশন, আরটিভি, বৈশাখী টেলিভিশন, দেশটিভি, মাই টিভি, মোহনা টেলিভিশন, মাছরাঙা, বিটিভি ওয়ার্ল্ড, সংসদ টেলিভিশন, এটিএন নিউজ, ইনডিপেনডেন্ট, সময়, চ্যানেল সিক্সটিন, চ্যানেল নাইন, চ্যানেল টুয়েন্টি ফোর, জিটিভি, একাত্তর টিভি, বিজয় টিভি, এশিয়ান টেলিভিশন, এসএ টিভি, গান বাংলা ইত্যাদি। এ বছরের শুরুতে কেবল একটি টিভি চ্যানেলই যোগ হয়েছে। সংবাদ ও তথ্যভিত্তিক এ চ্যানেলটির নাম যমুনা টিভি। তবে বছরের শেষ দিকে এসে চ্যানেল সিক্সটিন বন্ধ হয়ে যায়। সবমিলিয়ে বছর শেষে চ্যানেলের সংখ্যা আবার দাঁড়িয়েছে ২৭টিতে। সারা বছরের হিসাব নিকাষে দেখা যায়, ২০১৪ সালে কে কার চেয়ে বেশি চমকপূর্ণ অনুষ্ঠান প্রচার করবে তা নিয়ে সব ক’টি চ্যানেলের মধ্যে ছিল জোরালো প্রতিযোগিতা। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার মাঝেও বিটিভি তাদের ঈদের অনুষ্ঠানমালা সাজিয়েছে সুন্দরভাবে। বরাবরের মতো এ বছরও তাদের ঈদ অনুষ্ঠানমালায় ছিল বেশ বৈচিত্র্য। এ বছর উদযাপিত হয়েছে বিটিভির সুবর্ণজয়ন্তী। এ উপলক্ষে গত ২৫শে ডিসেম্বর শুরু হয়ে চলছে সাত দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য উদযাপন অনুষ্ঠান। বছরজুড়ে বিটিভির অনুষ্ঠানমালায় ‘ইত্যাদি’ ছিল সবার ওপরে। হানিফ সংকেতের মেধাবী নির্মাণশৈলী ও উপস্থাপনায় এ অনুষ্ঠানটির প্রতিটি আয়োজনই ছিল প্রশংসনীয়। এছাড়া এ বছর ঈদের বিশেষ আয়োজন ‘ঈদ আনন্দমেলা’ দীর্ঘদিন পর আবারও দর্শক প্রশংসা পেয়েছে। অবশ্য সার্বিকভাবে বিশেষ দিবস ছাড়া বিটিভির অনুষ্ঠানমালায় বৈচিত্র্য ছিল না। সরকারি দলের প্রভাব সম্পন্ন অনুষ্ঠান, সংবাদ এবং অন্যান্য প্রচার ছিল রাষ্ট্রীয় এ চ্যানেলটিতে। সংবাদে নতুনত্ব আনা হলেও তেমন পরিবর্তন চোখে পড়েনি। সরকারি খবর প্রচার-প্রচারণা বেশি গুরুত্ব পেয়েছে চ্যানেলটিতে। বেসরকারি চ্যানেলগুলোর মধ্যে অনুষ্ঠান নির্মাণে বরাবরই ভিন্নতা রাখে চ্যানেল আই। সে ধারাবাহিকতায় এ বছরও তাদের অনুষ্ঠান ও নাটকগুলো ছিল দর্শকের আলোচনায়। ‘আজকের সংবাদপত্র’, ‘তৃতীয়মাত্রা’ টকশো দুটি বরাবরের মতোই ছিল এগিয়ে। পাশাপাশি বছরজুড়ে প্রচারিত ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’ অনুষ্ঠানটি ছিল আলোচিত। এছাড়া ঈদ উপলক্ষে শাইখ সিরাজের ‘কৃষকের ঈদ আনন্দ’ ও ফরিদুর রেজা সাগরের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত নাটক ‘ছোটকাকু’ দর্শক বেশ সাদরে গ্রহণ করেছে। অন্যদিকে সুন্দরী প্রতিযোগিতা ‘লাক্স-চ্যানেল আই সুপারস্টার’ রিয়েলিটি শোটি ছিল চ্যানেলটির এ বছরের আলোচিত একটি অনুষ্ঠান। নাটকের মধ্যে ‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে’, ‘দাহ’ ছিল দর্শক জনপ্রিয়। এটিএন বাংলা বরাবরের মতো অনুষ্ঠানের মান বজায় রাখতে সচেষ্ট ছিল। প্রচার চলতি ধারাবাহিক ‘প্রজ্ঞাপারমিতা’, ‘নির্বিকার মানুষ’ নাটকগুলো বেশ আলোচনায় ছিল। এছাড়া স্মাইল শো, দেশের বিভিন্ন সেনানিবাস থেকে সরাসরি প্রচারিত অনুষ্ঠানগুলো দর্শক নজর কাড়ে। একখণ্ড ও ধারাবাহিক- দুই ধরনের নাটক প্রচারের জন্য এনটিভি বরাবরই এগিয়ে ছিল। এ বছরও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। গত বছর থেকে প্রচারে আসা এ চ্যানেলের ‘পরিবার করি কল্পনা’, ‘যোগযোগ গোলযোগ’ নাটকগুলো এ বছরও ছিল দর্শকের আগ্রহের জায়গায়। এছাড়া নতুন প্রচারে আসা ‘ফ্যামিলি প্যাক’ নাটকটিও বছরের শেষে এসে প্রশংসা পেয়েছে। বিভিন্ন উপলক্ষের পাশাপাশি বছরজুড়েই বাংলাভিশনের বিভিন্ন অনুষ্ঠান ব্যাপক দর্শক প্রশংসা পেয়েছে। বরাবরের মতো এবারও চ্যানেলটি নিজের অবস্থান সুদৃঢ় রেখেছে। টকশো ‘ফ্রন্ট লাইন’ ছিল বেশ আলোচিত। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে প্রচার চলতি ‘আমার আমি’ অনুষ্ঠানটি এবারও জনপ্রিয়তার ভাল অবস্থান ধরে রেখেছে। পাশাপাশি চ্যানেলটির মধ্যরাতের টকশো ‘নিউজ অ্যান্ড ভিউজ’, নাটক ‘অ-এর গল্প’, ‘হাটখোলা’-সহ আরও কয়েকটি ধারাবাহিক নাটক প্রশংসা পেয়েছে। এছাড়া ঈদ উপলক্ষে প্রচারিত ‘সিকান্দার বক্স’-সিক্যুয়ালের নাটকগুলো দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছে বেশ। ২০১৪ সালে আরটিভি বেশকিছু ধারাবাহিক নাটকের জন্য দর্শক ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। গত বছর থেকে চলে আসা ধারাবাহিক ‘অলসপুর’ এখনও সবার মুখে মুখে। আর বছরের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হওয়া ‘বিজলী’, ‘মায়ার খেলা’ নাটকগুলো দর্শক প্রশংসা পেয়েছে। এ চ্যানেলের টকশো ‘গোলটেবিল বৈঠক’ও ছিল দর্শকপ্রিয় একটি আয়োজন। একুশে টেলিভিশন বরাবরই টকশো প্রচারের জন্য বেশ সমাদৃত। এ চ্যানেলের ‘একুশের রাত’ এবারও প্রশংসা পেয়েছে। পাশাপাশি চ্যানেলটিতে প্রচার চলতি ‘থ্রি কমরেডস’, ‘মেঘের খেয়া’, ‘মামার হাতের মোয়া’ ধারাবাহিকগুলো দর্শকের প্রশংসা পায়। দেশটিভির অনুষ্ঠানমালা বরাবরই দর্শকের নজর কাড়তে সক্ষম হয়। এবারও তাদের আয়োজন ছিল ভিন্ন রকম। দর্শক চাহিদার কথা মাথায় রেখে বেশ কিছু ধারাবাহিক ও একখণ্ডের নাটক প্রচার করেছে বছরজুড়ে। মাছরাঙা টেলিভিশনের ‘ক্ষণিকালয়’, ‘পিঞ্জর’ ও ‘তিন গোয়েন্দা’ ধারাবাহিক নাটকগুলো বেশ প্রশংসা পেয়েছে এ বছর। এছাড়া এবারের ঈদে ‘রাঙারাত’ অনুষ্ঠানটি দারুণ দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছে। বছরজুড়ে ‘রাঙা সকাল’ ও ‘মধ্যরাতের ট্রেন’ অনুষ্ঠান দু’টিও বেশ প্রশংসা পেয়েছে। এছাড়া টকশো ‘মাছরাঙা সাম্প্রতিক’ ও ‘চারদিক’ ছিল বছরজুড়ে প্রশংসনীয় আয়োজন। চ্যানেল নাইন বছরজুড়ে ভিন্নধর্মী অনুষ্ঠান প্রচারে জোর চেষ্টা চালিয়েছে। নাটক, গানের অনুষ্ঠানসহ সবকিছুতেই নতুনত্বের ছোঁয়া ছিল। ‘ধন্যি মেয়ে’, ‘রাব্বু ভাইয়ের বউ’, ‘প্যাভিলিয়ন’, ‘লাভ গুরু ডটকম’ ধারাবাহিক নাটকগুলো এ বছরের দর্শকপ্রিয় নাটকে পরিণত হয়। এছাড়া ‘ট্রাভেলারস স্টোরি’, ‘ফিল্ম টকিজ’, ‘ভিন্ন স্বাদের সন্ধান’ অনুষ্ঠানগুলো চ্যানেলটির বিশেষ উপহার ছিল। ভিন্নধর্মী অনুষ্ঠান প্রচারের চেষ্টায় ছিল গাজী টেলিভিশনও। চ্যানেলটির ‘ক্রাইম ফাইল’, ‘আজকের অনন্যা’, ‘ওয়ার্ল্ড অব গ্ল্যামার’ ছিল উল্লেখযোগ্য অনুষ্ঠান। এছাড়া টক ‘সংবাদ সংলাপ’ ছিল বেশ দর্শকপ্রিয়। চ্যানেল টুয়েন্টিফোর প্রথমদিকে সংবাদের পাশাপাশি বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান প্রচার করলেও এ বছর এসে পুরোপুরি সংবাদভিত্তিক চ্যানেলে রূপান্তরিত হয়। বৈশাখী টেলিভিশনে পুরো বছর ভাল অনুষ্ঠান প্রচারের পাশাপাশি উৎসব-পার্বনে দেখা গেছে ভিন্নধারার আয়োজন। এ চ্যানেলের ‘শুধুই আড্ডা’, ‘বিজনেস টক’, ‘জিরো আওয়ার’, ‘সময় কাটুক গানে গানে’ দর্শক গ্রহণ করেছেন । এসএ টিভি কিছু নতুন ধারার অনুষ্ঠান প্রচার শুরু করে ইতিমধ্যেই দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছে। এর মধ্যে নাটক ‘আনন্দগ্রাম’, ‘ফেইস’ উল্লেখযোগ্য। এছাড়া সংবাদভিত্তিক চ্যানেলগুলো যেমন এটিএন নিউজ, সময়, ইনডিপেনডেন্ট, একাত্তর, যমুনা টিভি বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনে বেশ সচেতন ছিল। বিশেষ করে সময় টিভির টকশো ‘সম্পাদকীয়’, ইনডিপেনডেন্ট টিভির ‘আজকের বাংলাদেশ’, একাত্তর টিভির ‘একাত্তর জার্নাল’, এবং এসএ টিভির ‘লেট এডিশন’ টকশোগুলো বছরজুড়ে ছিল আলোচনায়। এদিকে সারা বছর ভাল কিছু অনুষ্ঠনের ভিড়ে মানহীন নাটক ও অনুষ্ঠানও প্রচার হয়েছে বিভিন্ন চ্যানেলে। ভারতীয় সিরিয়ালের অনুকরণে বেশ কিছু ধারাবাহিক নাটক এখনও প্রচারে রয়েছে। যেগুলো দর্শক দেখেই বুঝতে পারছেন এটা স্টার জলসা কিংবা প্লাস-এ একবার দেখেছেন। এ নিয়ে বিভিন্ন সময় নানা রকম অভিযোগ উঠলেও কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বরং চ্যানেল কর্তৃপক্ষ নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করার লক্ষে নানারকম যুক্তি দাঁড় করিয়েছেন। এছাড়া নাটকের একঘেয়ে ও বৈচিত্র্যহীন লোকেশন নিয়েও অভিযোগ ওঠে নানা মহলে। তবে সেটা স্বল্প বাজেটকে দায়ী করে এড়িয়ে চলেছেন সবাই। কলকাতার অনুষ্ঠান ‘মীরাক্কেল আক্কেল চ্যালেঞ্জার’, ‘সারেগামাপা’, ‘দিদি নাম্বার ওয়ান’সহ অনেক অনুষ্ঠানের হুবহু নকল অনুষ্ঠান প্রচার করেছে কয়েকটি চ্যানেল। বছরের মাঝে-মধ্যেই টিভি চ্যানেলগুলোর পর্দায় অস্থিরতা লক্ষ্য করা গেছে। চ্যানেলগুলোর বিভিন্ন সময়ের সংবাদে একই খবর পুনরাবৃত্তি দর্শকদের মধ্যে বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অতিমাত্রায় বিজ্ঞাপন প্রচারেও অতিষ্ঠ হয়েছেন দর্শকরা। এ নিয়ে বারবার চ্যানেলগুলোর সঙ্গে কথা হলেও তেমন কোন ফল পাওয়া যায়নি।
Think Tank Bangladesh 21232-/ 29