হিন্দুত্বের ধাক্কায় বিপন্ন ব্র্যান্ড মোদি
২০১৭

হিন্দুত্বের ধাক্কায় বিপন্ন ব্র্যান্ড মোদি

January 02, 2015     Published Time : 03:07:57

ব্র্যান্ড মোদি

বহু চেষ্টার পর গুজরাট দাঙ্গার কলঙ্ক মুছে নিজেকে উন্নয়নের কান্ডারি হিসেবে তুলে ধরে দিল্লির গদি দখল করেছেন নরেন্দ্র মোদি৷ দেশে বিদেশে ব্র্যান্ড মোদির যে মুখ তিনি তুলে ধরার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন সেখানেও মূল কথা উন্নয়নই৷ কিন্ত্ত তার এই সাধের ব্র্যান্ড পদে পদে ধাক্কা খাচ্ছে দলেরই কট্টরপন্থীদের জন্য৷ রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ যে ভাবে একের পর এক উগ্র হিন্দুত্বের কর্মসূচি নিয়ে দেশজোড়া প্রচারের দিকে এগোচ্ছে তাতে প্রমাদ গুনছেন নরেন্দ্র মোদি৷ পানি বিপদসীমা ছোঁয়ার আগেই পরিস্থিতি সামাল দিতে ময়দানে ত্রিফলা কর্মসূচি নিয়ে নেমেছেন তিনি৷ কিন্ত্ত সঙ্ঘ পরিবারের উপর আদৌ কতটা লাগাম পরাতে পারবেন মোদি, সে উত্তর স্পষ্ট করে দিতে পারছেন না কেউই৷

নিজের ধর্মনিরপেক্ষ মুখ তুলে ধরতে এর আগে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন সদ্ভাবনা যাত্রা করেছিলেন মোদি৷ কিন্ত্ত সেই অনুষ্ঠানে মুসলিম ধর্মগুরুর দেওয়া ফেজ টুপি পরতে অস্বীকার করে বিতর্ক বাড়িয়েছিলেন তিনি৷ বিরোধীরা বারবার দাবি তুললেও গুজরাট দাঙ্গার জন্য সংখ্যালঘুদের কাছে কখনো ক্ষমাও চাননি মোদি৷

কিন্ত্ত প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর নিজের সেই অনড় অবস্থান থেকে কিছুটা হলেও সরে আসতে হলো মোদিকে৷ ধর্মান্তরকরণের মতো সঙ্ঘ পরিবারের হিন্দুত্ব কর্মসূচি যাতে সংখ্যালঘুদের কাছে ভুল বার্তা না দেয় তার জন্য কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী মুখতার আব্বাস নাকভিকে দূত করে দেশের সব রাজ্যে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মোদি৷ আগামী দু-মাস ধরে নাকভি গোটা দেশ জুড়ে সফর করে সংখ্যালঘুদের অবস্থা দেখবেন৷ সংখ্যালঘুদের জন্য উন্নয়নমুখী প্রকল্প কতটা রূপায়ণ হয়েছে এবং তার সুফল কতটা, সেটা নাকভি খতিয়ে দেখবেন৷

একই সঙ্গে নিজের ব্র্যান্ড পুনরুদ্ধারে অমিতাভ বচ্চনকে দিয়ে বিজ্ঞাপন তৈরিরও সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মোদি৷ তাতে বিগ বি সকলকে জাতপাত ও ধর্মীয় সঙ্কীর্ণতার উপরে উঠে সকলের জন্য বিকাশের কথা বলবেন৷ তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে মোদি দ্বারস্থ হচ্ছেন সঙ্ঘ নেতৃত্বের৷ সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবতের কাছে আবেদন জানানো হবে যাতে হিন্দুত্বের বিষয়গুলি নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করা না হয়৷ ইতিমধ্যে যে ভাবে ধর্মান্তরকরণের মতো বিষয় নিয়ে হইচই শুরু হয়েছে, তাতে এখন থেকেই এই প্রবণতায় রাশ টানতে চান মোদি৷ কারণ এর জেরে শুধু দেশে নয়, বিদেশেও আলোচনা শুরু হয়ে গিয়েছে৷ এমনকি দেশের শিল্পপতিরাও বলা বলছেন, সরকার যতই সংস্কারের পথে হাঁটুক না কেন, সঙ্ঘ পরিবার যদি এভাবে হিন্দুত্বের কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে যায় তা হলে দেশে অস্থিরতা দেখা দেবে৷

বিজেপি সূত্রে বলা হচ্ছে, মোদির সঙ্গে মোহন ভাগবত ও ভিএইচপি-র প্রধান অশোক সিঙ্ঘলের সম্পর্ক খুবই ভালো৷ ভিএইচপি-তে কট্টর প্রবীণ তোগাড়িয়াকে আগেই কোণঠাসা করে রেখেছেন মোদি৷ এমনকি রামমন্দির নিয়েও বিতর্ক বাড়াতে চান না তিনি৷ আরএসএস নেতৃত্বের সঙ্গে বিজেপি নেতাদের ইতিমধ্যে বৈঠকও হয়েছে৷ সব মিলিয়ে মোদির ড্যামেজ কন্ট্রোলের প্রয়াস সফল হবে বলেই আশা বিজেপি নেতৃত্বের৷

কংগ্রেস অবশ্য বলছে, মোদির এই সব কর্মসূচি নিছকই লোক দেখানো৷ দলের মুখপাত্র অভিষেক মনু সিংভির দাবি, প্রধানমন্ত্রীর যদি বিরোধিতার উদ্দেশ্য থাকে, তা হলে তিনি প্রকাশ্যে ভাগবত, সিঙ্ঘলদের বিরোধিতা করুন৷ এসব গিমিক দিয়ে কোনো লাভ নেই৷ অন্য দিকে, নাকভি বলেছেন, 'আমরা চাই তৃণমূল স্তরে সকলের কাছে উন্নয়নের সুফল পৌঁছক৷ এদের একটা বড় অংশই সংখ্যালঘু৷ আমি তৃণমূল স্তরের মানুষের কাছে যাব, তাদের সমস্যার কথা শুনব ও সমাধান খোঁজার চেষ্টা করব৷' সংসদের বাজেট অধিবেশনের আগেই সব ক'টি রাজ্য ঘুরে সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রীদের সঙ্গেও বৈঠক করতে চান নাকভি৷

আমির খানের 'পিকে' নিয়ে সঙ্ঘ পরিবারের প্রতিবাদেও অস্বস্তি বেড়েছে বিজেপির৷ 'পিকে' নিয়ে প্রথমে তদন্ত করার কথা বলেও পিছিয়ে এসেছেন মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশ৷ প্রাথমিক ভাবে সঙ্ঘ পরিবারের চাপে পড়েও, সম্ভবত বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কথায় নতুন অবস্থান নিতে হয়েছে তাকে৷ এরই পাল্টা হিসাবে 'পিকে'-কে করমুক্ত করে দিয়েছেন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব৷ এই ধরনের বিতর্ক যদি ক্রমেই জোরদার হতে থাকে, তা হলে যে তার সংস্কারের প্রয়াস ধাক্কা খাবে তা ভালোই টের পাচ্ছেন মোদি৷ তিনি বুঝছেন হিন্দুত্ববাদী শক্তিগুলি এভাবে শক্তিপ্রদর্শন করতে থাকলে তার উল্টো প্রতিক্রিয়া হতে বাধ্য৷

অমিতাভ বচ্চনের সাহায্য এর আগেও মোদি নিয়েছেন৷ গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময় মোদি বিগ বি-কে দিয়ে গুজরাটে পর্যটন টানতে বিজ্ঞাপন করেছিলেন৷ অমিতাভের সুপারস্টার ইমেজের কল্যাণে সুফলও হাতেনাতে পেয়েছিলেন মোদি৷ সেই পরীক্ষিত অস্ত্রকেই ফের ব্যবহার করতে চান প্রধানমন্ত্রী মোদি৷ তবে এ বার সকলের বিকাশ ও ধর্মীয় উন্মাদনা বন্ধ করার জন্য৷ কিন্ত্ত সঙ্ঘ পরিবার, বিশেষত ভিএইচপি, বজরং দলের কট্টরদের লাগাম না পরালে অমিতাভের আবেদন আদৌ কতটা কাজে আসবে তা নিয়ে সংশয় থাকছেই৷
Think Tank Bangladesh 21232-/ 02