শেখ হাসিনা ঃ পলিটিশিয়ান অব দ্য ইয়ার
২০১৭

শেখ হাসিনা ঃ পলিটিশিয়ান অব দ্য ইয়ার

December 31, 2014     Published Time : 02:22:58

পলিটিশিয়ান অব দ্য ইয়ার

বিদায়ী বছরে পুরো রাজনৈতিক অঙ্গনই ছিল আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিয়ন্ত্রণে। তাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে সব রাজনৈতিক কর্মসূচি ও কর্মকাণ্ড। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তিনি প্রায় একক সিদ্ধান্তে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন করেছেন। ঘরে-বাইরে চরম সমালোচিত নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠিত হলেও শেখ হাসিনার ক্ষমতা ও সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করতে পারেননি কেউ। বরং পদে পদে আওয়ামী লীগের কৌশলের কাছে রীতিমতো পর্যুদস্ত হয়েছে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। জামায়াতে ইসলামী দেশব্যাপী ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েও শেখ হাসিনার দৃঢ়তায় বন্ধ করতে পারেনি যুদ্ধাপরাধের বিচার। পরাক্রমশালী যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমাদের চাপ-কৌশলের বিপরীতে বিশ্বরাজনীতি দ্বিতীয় ধারার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পৃক্ততাও ছিল শেখ হাসিনার অনন্য রাজনৈতিক কৌশল। সব মিলিয়ে রাজনীতির মাঠে শেখ হাসিনাই ছিলেন চালকের আসনে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাজনীতির ময়দান প্রায় একটি যুদ্ধের সমতুল্য। এখানেও যুদ্ধের মতো কৌশল নিতে হয়। আওয়ামী লীগের প্রধান হিসেবে শেখ হাসিনাও কৌশল নিয়েছেন। আগের বছরের শেষার্ধের কৌশল বাস্তবায়ন হয়েছে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে। কিন্তু সে কৌশল বুঝতেই পারেনি বিএনপি। তাই বিএনপি ছিটকে পড়েছে নির্বাচন থেকে। ফলে শুধু ক্ষমতার বাইরে নয়, সংসদেরও বাইরে চলে যেতে হয়েছে বিএনপিকে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর একটি মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রত্যাশা থাকলেও এক বছরেও দাবি প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি নির্বাচনের বাইরে থাকা দলগুলো। রাজনীতিতে যুগ যুগ ধরে ব্যবহার হয়ে আসা আইনি ও পুলিশি শক্তিতে কোণঠাসা ছিলেন বিরোধী নেতা-কর্মীরা। জনগণও পথে নামেনি মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবিতে। শেখ হাসিনাবিহীন যুদ্ধাপরাধের বিচার ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা ভালোভাবেই কাজ করেছে তরুণ প্রজন্মের একটি বৃহৎ অংশের মনে। আবার নির্বাচনের আগে বিএনপি-জামায়াতের সহিংসতার বীভৎস চিত্র বরাবরই প্রচারের আলোয় থাকায় আওয়ামী লীগের ধারাবাহিকতায় আপত্তি ছিল না কর্মজীবী মানুষের। বিএনপির অবরোধের মাধ্যমে শুরু হওয়া ২০১৪-এর শেষও হচ্ছে জামায়াতের হরতালের মাধ্যমে। কিন্তু থামছে না যুদ্ধাপরাধের বিচার। ক্রমেই ব্যাকফুটে চলে যেতে বাধ্য হওয়া জামায়াতের বাঁচা-মরার আন্দোলনও দমিয়ে দিয়েছে শেখ হাসিনার দৃঢ়তা। জামায়াতের প্রধান মিত্র বিএনপিও এখন হামেশাই বলতে বাধ্য হচ্ছে, 'জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক নির্বাচনী রাজনীতি'র। বছরজুড়ে বিভিন্ন কৌশল প্রয়োগের পরও শেখ হাসিনার হাতে এখনো রয়েছে নানান রাজনৈতিক অস্ত্র। এক বছর ধরে বিএনপি কয়েক দফা আন্দোলনের হুঙ্কার দিয়েও মাঠ গরম করতে পারেনি।

আগের মেয়াদের কয়েকটি দৃষ্টিনন্দন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতায় পদ্মা সেতুসহ বিভিন্ন উন্নয়নের ঘোষণাও দিয়েছেন শেখ হাসিনা। দেশীয় খরচে পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছেন। সুচিন্তিতভাবেই দেশের আপামর জনগণের চিন্তায় সংযোগ ঘটাতে সমর্থ হয়েছেন এ মুহূর্তে আরেকটি নির্বাচনের পরিবর্তে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা। ব্যবসায়ীরাও শান্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এখন স্বস্তিতে। তাদের জন্য সর্বোচ্চ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টিতে জোরালো ভূমিকায় সরকার। যেন ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের অধিকারী শেখ হাসিনা রাজনৈতিক সব ছকই আগে থেকে কষে রেখেছেন। মেধা ও প্রজ্ঞা দিয়ে সব বিরূপ পরিস্থিতিকে নিজের অনুকূলে নিয়ে এসেছেন তিনি। তাই তো '৭২-এর সংবিধানে ফিরে এলেও ফেরেনি ধর্মনিরপেক্ষতা। বার বার হুঙ্কার দিয়েও আওয়ামী লীগের আয়ত্তের বাইরে যেতে পারেনি ইসলামি দলগুলো। বেহুঁশ বক্তব্যের জন্য মুহূর্তেই সব হারিয়ে জেলে যেতে হয়েছে বর্ষীয়ান মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে। অন্যদিকে, শেখ হাসিনা জানেন এবারের মেয়াদের পথ চলা মসৃণ নয়। তাই আগের মেয়াদের মতো মন্ত্রিসভায় 'কচিকাঁচা'র আসর না বসিয়ে ফিরিয়ে এনেছেন পোড় খাওয়া রাজনীতিকদের। এতে আওয়ামী লীগের মহীরুহ হয়ে ওঠা রাজনীতিকরা পাঁচ বছরের দর্শক জীবন শেষে এখন নিজেদের প্রমাণ করার সুযোগও পেয়েছেন; যার সুফল পাবে শেখ হাসিনার সরকার ও আওয়ামী লীগ।

শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নয়, কূটনীতিকেও এক হাতে সামলিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আগের মেয়াদের মতো অন্যদের দায়িত্ব দিয়ে তাদের কাজকর্ম দূর থেকে দেখেননি। নিজেই একের পর এক দেশ সফর করে চলেছেন। নানান বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত চাপেও দমে যাননি। বরং বিশ্বরাজনীতিতে ক্রমেই শক্তিশালী হতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী পক্ষগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা নিবিড় করেছেন। এক কথায়, উন্নয়ন সহযোগী ও অংশীদার বানিয়ে ফেলেছেন রাশিয়া ও জাপানকে। প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের পরীক্ষিত বন্ধুত্বের বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করেছেন। বিশেষ করে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে যে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল তাকে ভুল প্রমাণিত করেছেন শেখ হাসিনা। পূর্বমুখী কূটনীতির অংশ হিসেবে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কোন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছেন। নিজের সরকারের উন্নয়নের মডেল হিসেবে উল্লেখ করেছেন চীনকে। নিজে গিয়েছিলেন চীন ও জাপানে। এ দেশে এনেছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রীকে। চীনের রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীও আসছেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা হিসেবে এমনিতেই বিশ্বদরবারে ভিন্নভাবে পরিচিত শেখ হাসিনা এখন নিজের স্বতন্ত্র পরিচয়ও তৈরি করেছেন নারীর ক্ষমতায়নের দূত হিসেবে।

সার্বিক বিচার-বিবেচনায় বলা যায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ বছরের 'পলিটিশিয়ান অব দ্য ইয়ার'।
Think Tank Bangladesh 21232-/ 31