সুইস ব্যাংকের টাকা ফেরতে অনিশ্চয়তা
২০১৭

সুইস ব্যাংকের টাকা ফেরতে অনিশ্চয়তা

January 03, 2015     Published Time : 04:51:35

সুইস ব্যাংক

সুইস ব্যাংকগুলোয় পাচার করা বাংলাদেশিদের টাকা ফেরত আনার বিষয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংককে (এসএনবি) ১৯৯২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত তিনবার চিঠিও দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসএনবি ওসব চিঠির উত্তর দেয়নি।

সর্বশেষ এসএনবির সঙ্গে এ-সংক্রান্ত একটি সমঝোতা চুক্তি করার আগ্রহ দেখায় বাংলাদেশ ব্যাংক। সে প্রস্তাবকেও পাত্তা দেয়নি ওই ব্যাংক। সুইস ব্যাংকে রাখা বাংলাদেশিদের টাকা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে চুক্তির আগ্রহ দেখিয়ে ২৬ জুন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান একটি চিঠিও দেন এসএনবিকে।

কিন্তু প্রায় ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও সুইজারল্যান্ড সাড়া দেয়নি। এ বিষয়ে জানতে বাংলাদেশ প্রতিদিনের পক্ষ থেকে এসএনবি কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার ই-মেইল করা হয়। তাতেও কোনো সাড়া মেলেনি। ফলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুইস ব্যাংকে চলে যাওয়া অর্থ ফেরত আনা কোনো সরকারের পক্ষেই সহজ নয়।

এটা সুইস সরকার ও এসএনবির সঙ্গে সমঝোতার বিষয়। এটা হয়তো কখনই সম্ভব নয়। এ ছাড়া ব্যাংকিং নীতিমালা অনুযায়ী গ্রাহকের তথ্য গোপন রাখা ব্যাংকের দায়িত্ব। এদিকে বিভিন্ন সময় বেশকিছু ব্যক্তির অর্থ পাচারের তথ্য প্রকাশিত হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের গোয়েন্দা ইউনিট (বিআইএফইউ) সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গোয়েন্দা ইউনিটের (এফআইইউ) কাছে তাদের নাম উল্লেখ করে তথ্য চেয়েছিল।

সেই তথ্যও সরবরাহ করেনি এসএনবি। এর আগে ১৯৯২ সালেও বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার হওয়া ও সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের বিপুল পরিমাণ টাকা রয়েছে- এমন তথ্য চেয়ে একই ধরনের একটি চিঠি দেওয়া হয়। ওই চিঠিরও কোনো জবাব দেয়নি এসএনবি। সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এসএনবি ‘ব্যাংকস ইন সুইজারল্যান্ড ২০১৩’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেই প্রতিবেদনে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অর্থাৎ ২০১৩ সাল শেষে সুইস ব্যাংকগুলোয় বাংলাদেশিদের অন্তত ৩৭ কোটি ১৯ লাখ সুইস ফ্রাঁ গচ্ছিত রয়েছে, যা প্রায় ৪১ কোটি ৪০ লাখ ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৩ হাজার ১৬২ কোটি ৩৭ লাখ টাকা।

এটি নতুন অর্থবছরের বাজেট ঘাটতি অর্থায়নে সরকার যে পরিমাণ প্রকৃত ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করেছে, তার প্রায় ৬ ভাগের ১ ভাগ। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে সরকার নিট বিদেশি ঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ১৮ হাজার ৬৯ কোটি টাকা। বাংলাদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের এই অর্থ সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে গচ্ছিত রয়েছে। এর আগে ২০১২ সাল শেষে সুইস ব্যাংকগুলোয় বাংলাদেশিদের অন্তত ২২ কোটি ৮৯ লাখ সুইস ফ্রাঁ গচ্ছিত ছিল, যা প্রায় ২৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার বা ১ হাজার ৯০৮ কোটি টাকার সমান।

এতে এক বছরের ব্যবধানে ১ হাজার কোটি টাকারও বেশি সুইস ব্যাংকগুলোয় পাচার করা হয়েছে। এসব প্রতিবেদন দেখে বাংলাদেশ ব্যাংক বার বার বিস্তারিত তথ্য চেয়ে চিঠি দেয় এসএনবিকে। কিন্তু একটি চিঠিরও জবাব দেয়নি সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে- সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোয় বর্তমানে বাংলাদেশিদের গচ্ছিত অর্থ প্রকৃতপক্ষে দেশ থেকে পাচার হওয়া কি না, এ বিষয়ে খোঁজ নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে গচ্ছিত ওইসব অর্থের প্রকৃত মালিককে শনাক্ত করারও পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

এজন্য শতাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের লেনদেন সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে গত অক্টোবরে সুনির্দিষ্টভাবে আট ব্যক্তির অর্থ লেনদেনের যাবতীয় তথ্য চেয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেশের সব তফসিলি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে চিঠি দেয়। এরপর গত নভেম্বরেও আরও বেশকিছু ব্যক্তির যাবতীয় লেনদেনের তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়। এদের মধ্যে রাজনীতিক ও ব্যবসায়ী রয়েছেন। কয়েকটি ব্যাংক লেনদেনের তথ্য না দেওয়ায় তাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংক জরিমানাও করে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিএফআইইউর কর্মকর্তারা বলছেন, সুইস ব্যাংকে জমা টাকার তথ্য জানা একটি জটিল প্রক্রিয়া। পুরো প্রক্রিয়াই অনুসরণ করতে আইনগত কিছু জটিলতা রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে ২০১৪ সালেও সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আরও টাকা যুক্ত হতে পারে।এ লক্ষ্যে মানি লন্ডারিং আইনের মাস্টার সার্কুলার জারি করা হয়েছে গত ২৮ ডিসেম্বর। সুইস ব্যাংকে পাচার হওয়া অর্থের উৎস জানতেই এ মুহূর্তে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাজ করছে।

তবে ভবিষ্যতে যেন কোনো ধরনের অর্থ পাচার না হতে পারে সেজন্য কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪ সালের জুলাইয়ে অর্থ পাচার রোধে বিশ্বের ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের সমন্বয়ে গঠিত সংগঠন এগমন্ড গ্রুপের সদস্য হয়। ২০০৮ সালে আবেদন করে ২০১৪ সালে এ সদস্যপদ পায় বাংলাদেশ। এগমন্ড গ্রুপের সদস্যপদ পেলেও সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো সমঝোতা চুক্তি না থাকায় কোনো তথ্যই বের করা যায়নি।

এদিকে গত ডিসেম্বরে ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যানশিয়াল ইন্টেগ্রিটির (জিএফআই) ‘ইলিসিট ফিন্যানশিয়াল ফ্লোজ ফ্রম ডেভেলপিং কান্ট্রিজ ২০০৩-১২’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- বাংলাদেশ থেকে বিদেশে অর্থ পাচার এক বছরের ব্যবধানে ২০০ শতাংশ বেড়েছে। ২০১১ সালে দেশ থেকে পাচার হয়েছিল ৫৯ কোটি ৩০ লাখ ডলার বা ৪ হাজার ৭৪৪ কোটি টাকা। ২০১২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৭৮ কোটি ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ১৪ হাজার ২৪০ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান অর্থনীতিবিদ ডেভ কার ও অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্পেনজারসের তৈরি প্রতিবেদনটি ১৬ ডিসেম্বর মধ্যরাতে প্রকাশ করা হয়।

এতে বিশ্বের উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলো থেকে এক দশকে কী পরিমাণ অর্থ অবৈধভাবে বাইরে চলে গেছে, তার একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রতি বছরের ডিসেম্বরে উন্নয়নশীল দেশগুলোর পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ সম্পর্কিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি।অর্থ পাচারের যেসব পন্থা রয়েছে, তারই একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মিস ইনভয়েসিং বা অস্বচ্ছ লেনদেন। জিএফআই বলছে, ২০১২ সালে মিস ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ৭৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার।

আর হট মানি আউটফ্লো বা ব্যালান্স অব পেমেন্টের মাধ্যমে পাচার হয়েছে ১০২ কোটি ৫০ লাখ ডলার। পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণের ক্রমানুসারে ১৫১টি উন্নয়নশীল দেশের একটি তালিকাও তৈরি করেছে জিএফআই। ২০১২ সালে বাংলাদেশের অবস্থান তাতে ৪৭তম। আর দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ রয়েছে দ্বিতীয় স্থানে।যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বাংলাদেশের অর্থ পাচার হচ্ছে এটা নতুন কোনো বিষয় নয়।

অনেক আগে থেকেই এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া যায়। কিন্তু এসব ঘটনা প্রমাণ করা খুব কঠিন। তার চেয়ে বড় জটিল হচ্ছে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনা। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক দেবপ্রসাদ দেবনাথ বলেন, পাচার করা অর্থ ফিরিয়ে আনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক চেষ্টা করে যাচ্ছে, এটা সময়সাপেক্ষ বিষয়। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়েরও বিষয় বলে মনে করেন তিনি।
Think Tank Bangladesh 21232-/ 03