ডিজিটাল চোরের খপ্পরে এটিএম লেনদেন
২০১৭

ডিজিটাল চোরের খপ্পরে এটিএম লেনদেন

December 29, 2014     Published Time : 03:18:39

এটিএম লেনদেন

* ঝুঁকিপূর্ণ গোপন ক্যামেরার ভিডিও

* জড়িত ব্যাংক কর্মকর্তারা

ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের অন্যতম অনুষঙ্গ এটিএম কার্ডের লেনদেনে প্রতারক চক্র ঢুকে পড়েছে। কার্ড ও পিনকোড চুরি করে টাকা উত্তোলনের ঘটনা ঘটছে হরহামেশা। বিভিন্ন তথ্যভা-ার থেকে গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য ও বুথে গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও থেকে পিনকোড চুরি করা হচ্ছে। এক জরিপে দেখা গেছে, কার্ডধারী ৪০ শতাংশ গ্রাহকের এটিএম কার্ড ব্যবহার করে টাকা চুরি করেছে দুষ্কৃতীরা। এ চুরি ঠেকাতে বিশেষজ্ঞরা অত্যাধুনিক প্রযুক্তির বায়োমেট্রিক এটিএম কার্ড ব্যবহারের কথা বলছেন।

এটিএম কার্ডের লেনদেন সমস্যা, জাল জালিয়াতি ও প্রতিরোধ নিয়ে ‘ইন্ট্রাডাকশন অব দ্য বায়োমেট্রিক এটিএম কার্ড ইন দ্য ব্যাংকিং সেক্টর অব বাংলাদেশ অ্যা ডিজিটাল ওয়ে টু রিডিউস দ্য ডিজিটাল ক্রাইম’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম)। জরিপভিত্তিক গবেষণাটি করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের প্রভাষক তাসলিমা আখতার ও আরিফিন ইসলাম। ব্যাংকার, ডাক্তার, গবেষক, শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন পেশাজীবী ১৮০ এটিএম কার্ড ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করেন গবেষকরা। প্রতিবেদনে বলা হয়, ডিজিটাল চোরেরা ৪৩ জন গ্রাহকের কার্ড ব্যবহার করে টাকা উত্তোলন করে নিয়েছে। এ সংখ্যা জরিপে অংশগ্রহণকারীর ২৪ শতাংশ। এটিএম কার্ডের জালজালিয়াতির ঘটনা শুনেছেন ২৮ গ্রাহক, যা ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ। সব মিলিয়ে ডিজিটাল চোরের খপ্পরে পড়ার অভিজ্ঞতা হয়েছে ৪০ শতাংশ জরিপে অংশ নেওয়া গ্রাহকের। তবে অর্ধেকের বেশি গ্রাহক কোনো ধরনের অপরাধের শিকার হননি এবং অন্যদের কাছ থেকে শোনেনি।

গবেষণায় বলা হয়, জরিপে অংশ নেওয়া গ্রাহকের ৩৬ শতাংশ প্রতি মাসে সর্বোচ্চ ৬ বার, ৩১ শতাংশ তিনবার, ১২ শতাংশ সর্বোচ্চ ১০ বার এটিএম কার্ড দিয়ে লেনদেন করেন। তবে ৯ শতাংশ গ্রাহক ওই মাসে কোনো লেনদেন করেননি।

জরিপকারী প্রভাষক তাসলিমা আখতার ও আরিফিন ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, আমরা প্রশ্ন পদ্ধতির মাধ্যমে সমস্যাগুলো জানতে পেরেছি। যে প্রক্রিয়ায় পিনকোড চুরি হচ্ছে এবং লেনদেনও হচ্ছে। এটি দুষ্কৃতীদের পক্ষে খুব বেশি কষ্টসাধ্য নয়। তাই আমরা মনে করছি উন্নত প্রযুক্তির বায়েমেট্রিক কার্ড ব্যবহার করলে চুরি ও জালজালিয়াতি রোধ করা সম্ভব।

গবেষকরা বলছেন, ডিজিটাল যুগে ‘আইডেনটিটি থেফট’ বা ‘পরিচিতি চোর’ বাড়ছে। ব্যক্তির পরিচিতি (নাম, পিতা-মাতা নাম, মোবাইল নম্বর, ই-মেইল আইডি, জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর, পাসপোর্ট নম্বর, ড্রাইভিং লাইসেন্স ইত্যাদি) চুরি করে ডিজিটাল চোরেরা বিভিন্ন সেবাদানকারী সংস্থার ডেটাবেসে প্রবেশ করতে পারছে। অনলাইন ব্যাংকিং এবং এটিএম কার্ডে লেনদেন এ ধরনের ব্যক্তিগত গোপন পরিচিতিনির্ভর সেবা। এই পরিচিতি চুরির মাধ্যমে পিনকোড জানা সম্ভব হয়। এরপর পিনকোড দিয়ে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে টাকা চুরি করতে সক্ষম হচ্ছে ডিজিটাল চোরেরা।

গবেষণায় বলা হচ্ছে, ২৪ ঘণ্টা ব্যাংকের বাইরে ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছে অটোমেটেড টেলার মেশিন (এটিএম) বুথ। প্লাস্টিক ম্যাগনেটিক-স্ট্রিপ কার্ড ব্যবহার করে এ লেনদেন করতে পারেন গ্রাহকরা।

চেকের বিকল্প হিসেবে এটি এখন দারুণ জনপ্রিয়। কার্ড দিয়ে টাকা উত্তোলন, ব্যালান্স অনুসন্ধান, টাকা স্থানান্তর ইত্যাদি কাজ খুব সহজেই করা যায়।

কিন্তু এই কার্ড কিছু গোপন নম্বর দিয়ে (পিনকোড) পরিচালিত হচ্ছে। ওই পিনকোড ব্যাংক সরবরাহ করছে। সহজ পদ্ধতির এ কার্ড ব্যবহার অনেক বাড়ছে, পাশাপাশি বাড়ছে চুরি ও জালিয়াতির ঘটনা।

গবেষকরা বলছেন, পিনভিত্তিক এ কার্ডে জালিয়াতি নাটকীয়ভাবে বাড়ছে। অনেকেই পিনকোড নিজ পরিবারের সদস্য, নিকট আত্মীয়, কলিগ বা বন্ধুবান্ধবকে বলে দেন। দুষ্কৃতকারী কার্ড ও পিনকোড চুরি করে খুব সহজেই এটিএম বুথ থেকে টাকা উঠিয়ে নিচ্ছে। পিনকোর্ড ঠিক থাকলেই মেশিনে লেনদেন করা যায়। আসল মালিক না অন্য কেউ কার্ড ব্যবহার করে লেনদেন করছে এটিএম বুথ দেখতে পারে না। এটিএম বুথে স্থাপিত গোপন ক্যামেরার তথ্য সংগ্রহ করে তারা পিনকোডসহ যাবতীয় গোপন নম্বর চুরি করছেন।

গবেষকরা বলছেন, এ ধরনের চুরি ঠেকাতে প্রয়োজন বায়োমেট্রিক এটিএম কার্ড। জীবন্ত মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও শব্দের মাধ্যমে এই কার্ডের গোপনীয়তা নিয়ন্ত্রিত। এটিএম কার্ড একস্তর কোনো কোনো ব্যাংক দ্বিস্তর বিশিষ্ট নিরাপত্তা কোড দিয়ে থাকে। বায়োমেট্রিক কার্ড পিনকোর্ড দিলে তৃতীয় স্তরে প্রত্যঙ্গের ছাপ বা শব্দ দিয়ে লেনদেন করা সম্ভব। মানুষের আঙুল, মুখম-ল কখনোই নকল করা সম্ভব নয়। তাই বায়োমেট্রিক কার্ড চুরি করে কেউ টাকা হাতিয়ে নিতে পারবে না।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, বায়োমেট্রিক কার্ড ব্যবহার করতে হলে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে হবে। তা ছাড়া এতে লেনদেন করতে অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করতেই বেশ সময় লেগে যাবে। যেহেতু অধিকাংশ গ্রাহক বুথে লেনদেন করেন। তাই ৩ ধাপে নিরাপত্তা ভাঙতে যে সময় লাগে, তাতে বুথেও ব্যাংকের মতো লাইন লেগে যেতে পারে। তবে চুরি থামাতে এর জুড়ি নেই। বাংলাদেশে এ পদ্ধতি চালু হয়েছে মাত্র।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, ১৯৯২ সালে একটি মাত্র এটিএম বুথ থেকে শুরু হয় এর যাত্রা। বর্তমানে দেশে কার্যরত ৫৬টি ব্যাংকের এটিএম বুথের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৬৬১টিতে। লেনদেনে হচ্ছে বছরে প্রায় সাড়ে ৬৫ হাজার কোটি টাকা। দেশে ক্রেডিট কার্ড প্রথম চালু হয় ১৯৯৭ সালে। ডেবিট কার্ড চালু হয় ১৯৯৯ সালে। এর পর থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত প্লাস্টিক কার্ডের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮০ লাখ ৮৫ হাজার ৮৩৪টিতে। এর মধ্যে ডেবিট কার্ডের সংখ্যা ৭২ লাখ ৩২ হাজার ৫৫৪টি এবং ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা ৮ লাখ ৫৩ হাজার ২৮০টি। এসব কার্ডের মাত্র ২ শতাংশ ‘চিপ’ ভিত্তিক যা তুলনামূলক নিরাপদ। বাকি ৯৮ শতাংশ কার্ড চুম্বক প্রলেপ (ম্যাগনেটিক স্ট্রিপ) দেওয়া, যা লেনদেনের জন্য খুবই অনিরাপদ এবং এগুলো জাল করা সহজ।
Think Tank Bangladesh 21232-/ 29