ক্যানটিনেও নজর চিফ হুইপের
২০১৭

ক্যানটিনেও নজর চিফ হুইপের

August 14, 2014     Published Time : 12:05:40

ক্যানটিনেও নজর চিফ হুইপের

পাঁচ বছর আগে ভাইয়ের ছেলেকে বিনা পয়সায় পার্লামেন্ট মেম্বারস ক্লাবের ক্যানটিনে ব্যবসা করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন আ স ম ফিরোজ। তখন তিনি ছিলেন ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও জাতীয় সংসদের হুইপ। আর ২০১৪ সালে তিনি চিফ হুইপ হয়েছেন। এবার নিয়ম জারি করলেন, সংসদের এলডি (লাঞ্চ অ্যান্ড ডাইনিং) হলে বিয়েসহ যেকোনো অনুষ্ঠানের খাবার কিনতে হবে ভাতিজার ক্যানটিন থেকেই।

এর আগে ন্যাম ভবন এবং পুরোনো এমপি হোস্টেলের সরকারি বরাদ্দের বাইরে সাতটি বাসা নিজের দখলে রেখে আলোচিত হন চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ। এর মধ্যে দুটি বাসায় তাঁর শ্যালক এবং এক বন্ধু পরিবার নিয়ে থাকেন। তারও আগে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর নিজের নির্বাচনী এলাকা পটুয়াখালীর বাউফলে দলের দেওয়া সংবর্ধনায় ‘ক্রেস্ট নয়, ক্যাশ চাই’ বক্তৃতা দিয়ে বিস্ময় জাগান চিফ হুইপ।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, ‘রয়েল লাউঞ্জ ক্যানটিন’ নাম দিয়ে ২০০৯ সাল থেকে আ স ম ফিরোজের ভাতিজা ইসতিয়াক রাব্বি পার্লামেন্ট মেম্বারস ক্লাবের ক্যানটিনে ব্যবসা শুরু করেন। এর বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও আসবাব—সবই সরকারের।

পার্লামেন্ট মেম্বারস ক্লাবের এক হিসাবে দেখা গেছে, সংসদের এলডি হলে বছরে শতাধিক বিয়ে, বউভাত, ইফতার মাহফিলসহ নানা ধরনের অনুষ্ঠান হয়। সাংসদ ও তাঁদের আত্মীয়-স্বজন ছাড়াও সাংসদদের সুপারিশে বাইরের মানুষও সেখানে অনুষ্ঠান করেন। অনুষ্ঠানভেদে পাঁচ-ছয় হাজার লোকের সমাগম হয়। হলের বাইরে তাঁবু টানিয়ে এমন আয়োজন চলে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, আগে পার্লামেন্ট মেম্বারস ক্লাব থেকে ছাপানো এলডি হলে বুকিং দেওয়ার জন্য যে ফরম আয়োজকদের দেওয়া হতো, তাতে হল ভাড়ার নিয়মকানুন, ভাড়ার পরিমাণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ফি, সংসদ এলাকার নিরাপত্তার বিষয়সহ ১৭টি শর্ত ছিল। আ স ম ফিরোজ দশম সংসদে চিফ হুইপ হওয়ার পর ফরমের ১৮ নম্বর শর্ত যুক্ত হয়। এতে বলা হয়, ‘অনুষ্ঠানের খাবার ক্লাবের অনুমোদিত ক্যাটারিংয়ের নিকট হইতে িনতে হইবে।’

একাধিক সাংসদ ও ক্লাবের একটি সূত্র জানায়, গত ফেব্রুয়ারি মাসে আ স ম ফিরোজের নির্দেশে এলডি হলে বুকিং দেওয়ার নিয়মাবলির ফরমে নতুন শর্ত যোগ করা হয়। তাতে ব্র্যাকেটে ক্যাটারিংয়ের মালিকের নাম ইসতিয়াক রাব্বি ও তাঁর মুঠোফোনের নম্বর উল্লেখ করা হয়। ইসতিয়াক রাব্বি চিফ হুইপের বড় ভাই ফজলে রাব্বির ছেলে।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে আ স ম ফিরোজ বিরক্তি প্রকাশ করেন। তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আচ্ছা, সংসদে কি এসব ছাড়া আর কিছু নেই লেখার? আমরা জাতীয় সংসদের সদস্য। আপনাদের করুণভাবে বলি, আমাদের এত নিচে নামাবেন না।’ খানিক পরে তিনি বলেন, ‘ক্লাবের সভাপতি আছেন। সব দায়িত্ব তো আমার না। ক্লাবের পরিচালনা কমিটি আছে, এখানে এককভাবে কেউ কিছু করতে পারেন না। প্রধানমন্ত্রী ও স্পিকারকেও জানাতে হয়।’

পার্লামেন্ট মেম্বারস ক্লাবের সভাপতি হলেন নবম সংসদের চিফ হুইপ আব্দুস শহীদ। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি  বলেন, ‘ক্যানটিন থেকে খাবার কেনার বিষয়টি দুজন সদস্য আমাকে ফোনে বলেছেন। বিষয়টি সম্পর্কে আমি কিছু জানি না।’

ভাতিজার ব্যবসায়িক স্বার্থে পার্লামেন্ট মেম্বারস ক্লাবের নাম ব্যবহার করে এ ধরনের শর্ত যুক্ত করায় কয়েকজন সাংসদ এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁরা মনে করেন, এ ধরনের শর্ত সাংসদদের জন্য অমর্যাদাকর। খাবারের দর ও মান নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তা হবে আরও বিব্রতকর। এ ছাড়া খাবার কেনার শর্তের কারণে এলডি হলে অনুষ্ঠান আয়োজনে অনেকে উৎসাহ হারাচ্ছেন বলেও তাঁরা জানান। 

অবশ্য আ স ম ফিরোজ দাবি করেন, ‘বিষয়টা ও রকম না। সম্ভবত ম্যানেজার লিখেছে, যাতে এখান থেকে খাবার নিলে আপনারা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন।’

বাংলাদেশ তরীকত ফেডারেশন গত ১৫ জুলাই এক হাজার ২০০ লোকের ইফতার আয়োজন করে এলডি হলে। তারা রয়েল লাউঞ্জ ক্যানটিনকে কেবল খাবার বাবদ তিন লাখ ৬০ হাজার টাকা পরিশোধ করে। বাজারদর অনুযায়ী খাবারের দাম অনেক বেশি ছিল বলে তরীকত ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় একজন নেতা জানান। দলটির চেয়ারম্যান ও মহাসচিব দুজনেই সাংসদ।

সরবরাহ করা খাবারের দর ও মান নিয়ে সংশয় থাকায় ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগের সাংসদ আসলামুল হক, সাবেক সাংসদ পিনু খান ও বিএনপিদলীয় সাবেক সাংসদ আশরাফ উদ্দিন নিজান বাইরে থেকে খাবার এনে অনুষ্ঠান করেন।

গণপূর্ত বিভাগ জানায়, সংসদ ভবনসংলগ্ন পুরোনো এমপি হোস্টেল ঘিরে তিনটি এলডি হল আছে। এর একটিতে স্বাস্থ্যকেন্দ্র, একটিতে পার্লামেন্ট মেম্বারস ক্লাব এবং বাকিটি কমিউনিটি সেন্টার হিসেবে ভাড়া দেওয়া হয়। এটি নিয়ন্ত্রণ করে পার্লামেন্ট মেম্বারস ক্লাব। কর্তৃপক্ষ হলের ভাড়ার জন্য সাংসদদের থেকে ভ্যাট, আনুষঙ্গিক ফিসহ ২০ হাজার ৫০০ টাকা এবং বাইরের লোকদের কাছ থেকে ৬০ হাজার ৫০০ টাকা নেয়।

রয়েল লাউঞ্জের অনুমোদন নেই পার্লামেন্ট মেম্বারস ক্লাবের কাগজপত্রে রয়েল লাউঞ্জ ক্যানটিনের কোনো অস্তিত্ব বা অনুমোদন নেই। প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে ক্যানটিন পরিচালনার ব্যবসা পেল, এ-সংক্রান্ত কোনো তথ্য ক্লাবের নথিপত্রে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

ক্লাবের একাধিক কর্মকর্তা জানান, ২০০৯ সালে আ স ম ফিরোজ ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পর তাঁর মৌখিক নির্দেশে ভাতিজা ইসতিয়াক রাব্বিকে ক্যানটিনের দায়িত্ব দেওয়া হয়। 

এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে আ স ম ফিরোজ বলেন, ‘পরিচয় বড় কথা না। আসলে এখানে ক্যানটিন চলে না, আমরা চালাতে পারি না। তাই একজনকে ডেকে এনে সম্মান রক্ষা করছি।’

আরও তিন ক্যানটিন জাতীয় সংসদের ভেতরে ও বাইরে আরও দুটি এবং মানিক মিয়া অ্যাভিনিউর ৬ নম্বর সদস্য ভবনের পাশে একটি ক্যানটিন আছে।

সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১১ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে এই তিনটি ক্যানটিন এক বছরের জন্য ইজারা দেওয়া হয়। অবশ্য এরপর আর ইজারা হয়নি। তবে সংসদ ভবনের ভেতরের ভিআইপি ক্যানটিনের ইজারাদার এটি ছেড়ে চলে গেছেন। এখন এটি চালাচ্ছে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন।

বাকি দুটি ক্যানটিন ইজারার মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পরও আগের লোকজন চালাচ্ছেন। এর মধ্যে পুরোনো এমপি হোস্টেল এলাকায় ঘরোয়া রেস্টুরেন্ট নামে ক্যানটিন চালান জনৈক মো. আলেফ মিয়া। সাবেক হুইপ মির্জা আজমের সুপারিশে তাঁকে এটি দেওয়া হয়েছিল। আর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউর ক্যানটিন মানিকগঞ্জ হোটেল অ্যান্ড সুইটমিটের নামে ইজারা নিয়েছিলেন জনৈক ছানাউল্লাহ। পরে তিনি মাসিক ১৫ হাজার টাকা ভাড়ায় ছিদ্দিকউল্লাহ নামের আরেক ব্যক্তিকে ক্যানটিনটি চালাতে দেন।

সংসদ সচিবালয়ের সদস্য ভবন শাখার প্রশাসনিক কর্মকর্তা সুজিত কুমার দেব দাবি করেন, দুটি ক্যানটিনের ইজারার মেয়াদ পরে বাড়ানো হয়েছে। নতুন করে দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়াও চলছে।

অবশ্য আ স ম ফিরোজ দাবি করেন, ক্যানটিন পরিচালনা নিয়ে ওঠা এসব অনিয়মের অভিযোগ হচ্ছে ‘কাজের সমালোচনা’। তিনি বলেন, ‘আমরা রাজনীতি করি। আমাদের বিপক্ষে অনেক লোক থাকে। এদের কাজই হচ্ছে সমালোচনা করা। নেত্রী বলেছেন, গাছে আম থাকলে ঢিল ছুড়বেই। কাজ করলে সমালোচনা হবে।’
Think Tank Bangladesh 21232-/ 14