আমি কি বাঁচতে পারব ?
২০১৭

আমি কি বাঁচতে পারব ?

August 30, 2014     Published Time : 20:32:18

গণহত্যা শব্দটির সাথে অনেক আগে থেকেই পরিচিত ছিলাম। বাবা ইতিহাসের ছাত্র হওয়ায় মাকে প্রায় ইতিহাসের গল্প শোনাতেন। আমি মায়ের কোলে শুয়ে বাবার গল্পগুলো মনোযোগ সহকারে শুনতাম। বাবা বেশির ভাগ সময়ই ট্রাজিডিক গল্প শোনাতেন। গল্প শুনে কষ্টে গলা আঢ়ষ্ঠ হয়ে আসত। চোখ দিয়ে অঝরে পানি ঝরতো। স্ট্যার্ন্ডাড ২ পড়াকালীন সময় থেকেই বাবার কাছ থেকে বিভিন্ন দেশে ঘটা নৃশংস গণহত্যার গল্প শুনেছি। বাবার কাছ থেকে জেনেছি বসনিয়ার গণহত্যা, রুয়ান্ডার গণহত্যা, আজার বাইজানের গণহত্যা,কম্বোডিয়ার গণহত্যা, কাতিন গণহত্যা, বাংলাদেশের গণহত্যা, ভারতের গুরজারটের গণহত্যা, আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে গণহত্যা, মায়ানমারসহ আরো কয়েকটি দেশে গণহত্যার কথা। খেয়াল করেছি এসব গণহত্যায় যাদের প্রাণ গেছে তাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। যারা যুদ্ধ কি বোঝে না। আজ নিজের দেশেই গণহত্যা দেখছি।

সন্ধ্যার আগেই বাবা বাড়িতে ফিরলেন। তড়ি ঘড়ি করে ল্যাপটপ নিয়ে বসলেন। বাবা সাধারণত রাত ১০টার আগে বাড়িতে ফিরে আসেন না। বাবা অসময়ে বাসায় ফিরে আসায় আমরা উদ্বীগ্ন হয়ে পড়লাম। কোন কথা না বলে বাবার পাশে গিয়ে বসলাম। কম্পিউটারের দিকে তাকালাম। দেখলাম কয়েকটি শিশুর ছিন্ন ভিন্ন দেহ মাটিতে লুটিয়ে আছে। আরেকটি ছবিতে দেখলাম কয়েকজন বন্ধুক ধারী একজন নিরস্ত্র মানুষকে জোর করে ধরে নিয়ে যাচ্ছে আর পেছন থেকে ছোট্ট এক শিশু ওই মানুষটার জামা টেনে ধরেছে। সম্ভবত উনি শিশুটির বাবা হবেন। মা ও আমাদের পাশে বসে পড়লেন।

মৃত শিশুদের ছবিগুলো দেখে মা আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, মা মনি মনের ভুলেও বাইরে যেও না। বাবা ভয়ার্ত কন্ঠে মাকে বলল, ওরা ট্যাংক নিয়ে গোলা ছুঁড়ছে। এবার আর কাউকে বেঁচে থাকতে দিবে না। ট্যাংক শব্দটিও আমার কাছে পরিচিত ছিল তবে ধারণাটা অতোটা পরিস্কার ছিলনা। ট্যাংক কি জানতে চাইলে বাবা বুঝিয়ে বললেন। এরই মধ্যে বিকট শব্দ। বাবা-মা আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। মা দোয়া-দরুদ পড়তে লাগলেন। মায়ের ঠোট এতটা কাঁপছে যে পরিচিত দোয়াগুলো অপরিচিতের মতো লাগছে। ইসরাইলী সৈন্যরা গাজায় হামলা করেছে জানতাম। কিন্তু আমাদের মত শিশু-কিশোরদেরও হত্যা করবে তা বুঝতে পারিনি। রাত গভীর হয়ে এলো আমি মায়ের কোলে ঘুমিয়ে পড়লাম। হঠাৎ বিরামহীন বিকটশব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল। ভোর হয়ে এসেছে। বাইরে বেরুতে ইচ্ছে হচ্ছিল। কিন্তু মায়ের বকুনিতে বের হতে পারছিলাম না। বাবাকে রাজি করিয়ে বাবার সাথে বাইরে বের হলাম। দেখলাম আমাদের বাড়ি থেকে ১০/১২টি বাড়ির পরের একটি বাড়িও আর নেই। গোলার আঘাতে সব গুঁড়িয়ে দিয়েছে হায়েনারা। কাছাকাছি যেতেই দেখলাম আমার খেলার সাথী সামিয়া, লাবিয়ার রক্তাক্ত দেহ ইট পাথরের মধ্যে চাপা পড়ে আছে। লাবিয়ার বাবা-মায়ের ছিন্নভিন্ন নিথর দেহ কংক্রীটের আস্তরনে ঢাকা। আরেকটু এগিয়ে যেতেই দেখলাম জাহিন, রাব্বা, ফাইসা, জহুরার হাত পা ছিন্ন মৃতদেহ। জাহিনের ছোট বোন ফাতেমার মাথার খুলি পুরো ফাঁকা, একটুকরা মগজও নেই। কষ্টে দম বন্ধ হয়ে আসছিলো তবে ভয় পাচ্ছিলাম না। কারণ হয়তো একটাই, আমরা যে ফিলিস্থিনি। একটু দূরে চোখ গেল। একটি পুতুল পড়ে আছে বলে মনে হচ্ছিল।

গত জন্মদিনে আমার খালাত বোন জান্নাতের দেয়া পুতুলের মতো। হাত-পা খুলে গেছে। কোমর থেকে আলাদা হয়ে গেছে। বাবার কাছ থেকে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে এগিয়ে গেলাম ওই দিকে। একি! এতো জান্নাত আপুর ভাগ্নি রুলি। এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। চিৎকার দিয়ে কাঁদতে লাগলাম। বাবা ছুটে আসলেন। হাত দিয়ে আমার চোখ দুটো ঠেসে ধরলেন। তারপর কোলে নিয়ে দ্রুত বাড়িতে ফিরে আসলেন। আশ্রয় কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য বাবা, মাকে গুছিয়ে নিতে বললেন। মা বাড়ি ফেলে যেতে চাচ্ছেন না। হঠাৎ করেই বাবা মাকে ধমক দিয়ে বললেন , তোমার কাছে এই বাড়ি বড় না তোমার মেয়ে রুকাইয়া বড়? এর পর মায়ের দিকে ফ্যাল ফ্যাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে নরম গলায় বললেন, রুকাইয়াতো আমাদের জান। ওর জন্যই আমাদেরকে আশ্রয় কেন্দ্রে যেতে হবে। নইলে আজই হয়তো আমাদের বাড়ি গুঁড়িয়ে দেয়া হবে। তুমি, আমি, রুকাইয়া সবাই মারা যাবো। বাবার কথা শুনে মা তড়ি ঘড়ি বেরিয়ে গুছিয়ে নিল। আমরা বেরিয়ে পড়লাম। তখন বিকাল ৫ টা। বাড়ি ছেড়ে প্রায় আধা কি.মি. পথ আসলাম। হঠাৎ বাবা চমকে উঠলো। মাকে কি যেন ইশারা করল। দেখলাম দূর থেকে ইসরাইলী সৈন্যরা রাইফেল তাক করে আমাদের দিকে তেড়ে আসছে। বাবা আমাকে দ্রুত পালাতে বলল। আমি পালাতে চাচ্ছিলাম না। বাবা আমাকে জোরে ধাক্কা দিল। আমি গড়াতে গড়াতে ধ্বংশপ্রাপ্ত একটি বিল্ডিং এর এক কোণে এসে ঠেকলাম। ইট পাথরের আঘাতে শরীরের অনেক অংশ ক্ষত-বিক্ষত হয়ে রক্তাক্ত জখম হলাম। ভাঙ্গা বিল্ডিং এর এক কোণে লুকিয়ে পড়লাম। কয়েকটি গুলির শব্দ শুনলাম। আমার শরীর নিথর হয়ে আসল। বেশ কিছুক্ষণ ধরে চেষ্টা করে উঠে দাঁড়ালাম। খুঁড়িয়ে খুঁিড়য়ে বাইরে বের হলাম। আমার জন্মদাতা পিতা-মাতা হায়েনাদের বুলেটের আঘাতে ক্ষত বিক্ষত অবস্থায় পড়ে আছে। হাউমাউ করে কেঁদে উঠলাম। চিৎকার করে বললাম, যে সন্তানকে বাঁচানের জন্য তোমরা নিজের জীবনকে বিলিয়ে দিলে। তাকে কি হায়েনারা বাচঁতে দেবে? ওদেরতো তার্গেট ভবিষ্যত প্রজন্মকে শেষ করে দেয়া। ওরা ফিলিস্থিনের কোন মা ও শিশুকে বেঁচে থাকতে দেবে না। আমার কান্নার শব্দে কয়েকজন মুখোশধারী মানুষ ছুটে আসলেন। তাদের একজন আমাকে কোলে তুলে নিলেন। আরেকজন আমার চোখের পানি মুছে দিলেন। তারা আমাকে আদর করতে করতে বললেন, মা তোমার দুই আপনজন মারা গেছেন তাতে কি হয়েছে? দেখ তোমার পাশে এরা সবাই আছে। এরা সবাই তোমার আপনজন। কান্না করো না। বুঝলাম এরা আমাদের দেশের বীর যোদ্ধা। যোদ্ধারা বাবা মায়ের লাশ নিয়ে এসে আমাদের বাড়ির উঠানে তাদেরকে কবরস্থ করলেন।

সন্ধ্যার দিকে একজন যোদ্ধা আমাকে আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে আসলেন। এখানে আমার মত অনেক শিশু আছে। রাতে আমাদের ঘুমিয়ে পড়তে বলা হলো। আমরা শুয়ে পড়লাম। ঘুম আসছে না। সবার নিঃশব্দ কান্না এক সময় স্বশব্দ কান্নায় পরিনত হল। আমার মাথা ঠান্ডা হয়ে আসছে। নাক বন্ধ হয়ে আসছে। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। বালিশে হাত দিয়ে দেখি সম্পূর্ণ ভিজে গেছে। ঘুম আসছেনা। বাবা মাকে ছাড়া এই প্রথম একাকী শুয়ে আছি। গভীর রাত। এক সময় সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে বাড়িতে চলে আসলাম। চাঁদের আলোয় বাবা মার কবর খুব উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল। এক রাশ প্রশান্তিতে হৃদয় মন ভরে গেল। আমি বাবা মার কবরের মাঝখানে শুয়ে পড়লাম। কি শান্তি। আকাশের দিকে চেয়ে দুই হাত বাবা মার কবরে ছড়িয়ে দিয়ে মাথাটা মায়ের কবরের ওপর রাখলাম। খুব ঘুম পাচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই হয়তো আমি ঘুমিয়ে পড়ব।
Think Tank Bangladesh 21232-/ 30